ওয়েব ডেস্ক: মালদহের বামনগোলার একটি স্কুলে ছাত্রছাত্রী ও এক মহিলা অশিক্ষক কর্মীর মধ্যে হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। স্কুলের মধ্যেই দুই পক্ষের মারামারির ছবি ইতিমধ্যে সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনাটি বামনগোলার জগদলা হাইস্কুলের।
স্কুল সূত্রে জানা গিয়েছে, এক প্রাক্তন ছাত্রের স্কুল সার্টিফিকেট দেওয়া নিয়ে প্রথমে বিবাদের সূত্রপাত। অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট প্রাক্তন ছাত্র বর্তমানে সংশোধিত নাম অনুযায়ী সার্টিফিকেট দাবি করেন। কিন্তু স্কুলের মহিলা অশিক্ষক কর্মী জানান, স্কুলের সরকারি নথিতে যে নাম রয়েছে, সেই নামেই সার্টিফিকেট দেওয়া সম্ভব।
এর পরেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ। প্রাক্তন ছাত্রের হয়ে দ্বাদশ শ্রেণির এক পড়ুয়া এবং আরও কয়েক জন ছাত্রী ওই মহিলা অশিক্ষক কর্মীর সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েন। পরে তা হাতাহাতি ও মারামারির পর্যায়ে পৌঁছয়। স্কুল চলাকালীন এই ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষিকা, পড়ুয়া এবং কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
আক্রান্ত মহিলা অশিক্ষক কর্মীর অভিযোগ, তাঁর উপর হামলার পিছনে স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তথা টিআইসি অমিত হালদার এবং আরও এক সহ-শিক্ষকের ইন্ধন ছিল। মারধরের ঘটনায় তিনি আহত হন। পরে তাঁকে চিকিৎসার জন্য বামনগোলার মুদিপুকুর গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযোগ, সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মহিলা অশিক্ষক কর্মীর পক্ষের লোকজনের সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এবং আরও এক শিক্ষকের মারামারি হয় বলে অভিযোগ। ঘটনার জেরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে আক্রান্ত মহিলা অশিক্ষক কর্মীকে মালদহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো হয়।
ঘটনার পর মহিলা অশিক্ষক কর্মী স্কুলের পরিবেশ এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, প্রায় দেড় বছর আগে স্কুলে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই মিড-ডে মিল-সহ একাধিক বিষয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তাঁর নজরে আসে। তিনি সেই সব বিষয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, এর পরেই তাঁকে এবং আরও এক মহিলা কর্মীকে কুপ্রস্তাব ও যৌন হেনস্থার অভিযোগ ওঠে ভারপ্রাপ্ত টিআইসির বিরুদ্ধে।
ওই অশিক্ষক কর্মীর দাবি, সে সময় তিনি সংশ্লিষ্ট থানার পাশাপাশি স্কুল শিক্ষা দপ্তরেও লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই অভিযোগের ভিত্তিতে কার্যকর কোনও তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁর আরও অভিযোগ, অভিযুক্ত টিআইসি-সহ কয়েক জন শিক্ষক স্থানীয় শাসকদলের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সুবিধা পেতেন। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন ভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমান ঘটনার সূত্রপাত নিয়েও মহিলা অশিক্ষক কর্মীর বক্তব্য আলাদা। তাঁর দাবি, এক প্রাক্তন ছাত্রের টিসি দেওয়ার সময় স্কুলের রেজিস্টারে নামের বানানে ভুল ধরা পড়ে। সংশোধিত নাম অনুযায়ী টিসি দেওয়ার বিষয়ে তিনি সই করতে রাজি হননি। এরপরই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পড়ুয়াদের উস্কে দিয়ে স্টাফরুমে তাঁর উপর হামলা চালান এবং তাঁকে শ্লীলতাহানি করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
ঘটনায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক-সহ দু’জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। স্কুলের ভিতরে এই ধরনের ঘটনা ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর।
দক্ষিণ মালদহের বিজেপির সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায় ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, একজন মহিলা অশিক্ষক কর্মীকে স্কুলের ভিতরে যেভাবে মারধর করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে কুপ্রস্তাব দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। পুলিশ প্রশাসনকে দ্রুত তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি স্কুলে রাজনৈতিক প্রভাব বা রাজনীতি বরদাস্ত করা হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্য দিকে, গোটা ঘটনা নিয়ে স্কুল শিক্ষা দপ্তরের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন বলেন, বিষয়টি দপ্তরের আধিকারিকরা খতিয়ে দেখছেন। এখনও তাঁর কাছে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট এসে পৌঁছয়নি বলেও জানান তিনি।
স্কুলের ভিতরে পড়ুয়া ও অশিক্ষক কর্মীর মধ্যে প্রকাশ্যে মারামারি এবং তার পর একাধিক অভিযোগ ঘিরে জগদলা হাইস্কুলের পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তে কী তথ্য সামনে আসে, এখন সে দিকেই নজর।











