নয়া দিল্লি: যন্তর মন্তরে শনিবারের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে ট্রেন ও মেট্রো পরিষেবা নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্ক তুঙ্গে। কেন্দ্রীয় সরকারের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি। শুক্রবার সেই মামলার শুনানিতে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের স্পষ্ট বার্তা, নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে গিয়ে জনজীবন সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেওয়া যায় না।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চের মন্তব্য, ‘‘মাছি মারতে কেউ হাতুড়ি চালায় না!’’ আদালতের পর্যবেক্ষণ, শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াতের জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সরকারি পরিবহণের উপর নির্ভর করেন। নিরাপত্তার কারণে তাঁদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পরিষেবা থেকে বঞ্চিত করা যায় না।
‘সব কিছু বন্ধ করে দেওয়া যায় না’
শনিবার যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, ছাত্র ও অন্যান্য সংগঠনের কর্মসূচি রয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এই কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। এর আগে দিল্লিতে একাধিক মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা এবং দিল্লিগামী ট্রেন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তাঁদের যন্তর মন্তরে পৌঁছোনো আটকাতেই এই পদক্ষেপ করেছে কেন্দ্র। সেই অভিযোগ তুলে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি। তাঁর হয়ে আদালতে সওয়াল করেন আইনজীবী কপিল সিব্বল।
শুনানিতে সিব্বলের বক্তব্য, একের পর এক ট্রেন বাতিল করা হয়েছে, মেট্রো স্টেশনের প্রবেশপথও বন্ধ রাখা হচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির আগে এই ধরনের বিধিনিষেধ কেন জারি করা হচ্ছে?
এই প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি বলেন, সব মেট্রো স্টেশনের প্রবেশপথ বন্ধ রাখার নির্দেশ নিয়ে আদালত উদ্বিগ্ন। তবে সেই উদ্বেগ কেবল আন্দোলনকারীদের যাতায়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিদিন কাজের প্রয়োজনে দিল্লি থেকে গুরুগ্রাম, গ্রেটার নয়ডা, পূর্ব দিল্লি এবং দক্ষিণ দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করেন অসংখ্য মানুষ। তাঁদের সমস্যার কথাও প্রশাসনকে বিবেচনা করতে হবে।
নিরাপত্তার ব্যবস্থা হোক, পরিষেবা বন্ধ নয়
সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য নিরাপত্তার প্রয়োজনে প্রশাসনের বিধিনিষেধ জারির অধিকারও স্বীকার করেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতেই পারে। কিন্তু সেই যুক্তিতে সমস্ত পরিবহণ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রধান বিচারপতির বক্তব্য, প্রত্যেকের নিজস্ব গাড়ি বা ব্যক্তিগত যানবাহন নেই। বহু মানুষ প্রতিদিনের যাতায়াতের জন্য ট্রেন ও মেট্রোর উপর নির্ভর করেন। তাই নিরাপত্তার নামে এই পরিষেবাগুলি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নয়।
আদালত জানিয়ে দিয়েছে, শনিবার ট্রেন ও মেট্রো চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রাখা যাবে না। পরিষেবা চালু রাখার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে সাধারণ যাত্রীদের অসুবিধা না হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী মেট্রোর সংখ্যা কমানো যেতে পারে, কিন্তু পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না বলেও পর্যবেক্ষণ করেছে বেঞ্চ।
দিল্লির যে সব রাস্তা শনিবার বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে, সেগুলিও পুনর্বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছে আদালত। সাধারণ মানুষের যাতায়াত যাতে ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করতে সংশোধিত নির্দেশিকা জারির কথাও বলেছে শীর্ষ আদালত।
কেন্দ্রের আশ্বাস, প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলবেন তুষার মেহতা
শুনানিতে কেন্দ্রের হয়ে উপস্থিত সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে আশ্বাস দিয়েছেন, ট্রেন ও মেট্রো স্টেশন সংক্রান্ত বিধিনিষেধ নিয়ে তিনি সরকারের সঙ্গে কথা বলবেন। সাধারণ মানুষের অসুবিধার বিষয়টি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। কোনও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলার সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে প্রশাসন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে সেই ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে নিত্যযাত্রীদের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
বাতিল রাজধানী এক্সপ্রেস, দূরপাল্লার ট্রেন নিয়েও দুর্ভোগের অভিযোগ
শনিবারের কর্মসূচির আগে রেল পরিষেবা নিয়েও একাধিক অভিযোগ উঠেছে। খবর অনুযায়ী, হাওড়া ও শিয়ালদহ থেকে দিল্লিগামী রাজধানী এক্সপ্রেস বাতিল করা হয়েছে। শুক্রবার ছাড়ার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট ট্রেন ছাড়েনি বলে অভিযোগ।
শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনগামী একাধিক দূরপাল্লার মেল ও এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রাপথ পরিবর্তন করা হচ্ছে। কিছু ট্রেন বাতিলও করা হয়েছে বলে খবর।
এ ছাড়া মধ্যপ্রদেশের ইটারসি জংশনে গোয়া এক্সপ্রেস-সহ একাধিক ট্রেন থামিয়ে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস ফেডারেশন (এআইএসএফ) এবং অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের জোর করে নামিয়ে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। যদিও এই সমস্ত ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ও প্রশাসনের বক্তব্য সামনে আসা প্রয়োজন।
ট্রেন চলাচলে আচমকা বিধিনিষেধের জেরে আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীরাও সমস্যায় পড়েছেন বলে অভিযোগ। এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
নজর কেন্দ্রের পরবর্তী পদক্ষেপে
শনিবার যন্তর মন্তরের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পরিবহণ পরিষেবা নিয়ে কেন্দ্রের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব প্রশাসনের হলেও সাধারণ মানুষের যাতায়াতের অধিকার উপেক্ষা করা যাবে না।
এখন দেখার, শীর্ষ আদালতের নির্দেশের পর ট্রেন ও মেট্রো পরিষেবা নিয়ে কী সংশোধিত ব্যবস্থা গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় সরকার এবং দিল্লি প্রশাসন। একই সঙ্গে, বাতিল ও পথ পরিবর্তন করা ট্রেনগুলির বিষয়ে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে কী পদক্ষেপ করা হয়, সেদিকেও নজর থাকবে।











