ওয়েব ডেস্ক: ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর—এই সতর্কবার্তা কমবেশি সকলেরই জানা। কিন্তু নিজে ধূমপান না করলেও কি সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকা যায়? চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, না। ধূমপায়ীর পাশে নিয়মিত থাকা, বাড়ি কিংবা কর্মস্থলে অন্যের সিগারেটের ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করা—অর্থাৎ পরোক্ষ ধূমপানও (Passive Smoking) শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
সাম্প্রতিক এক সমীক্ষার ফলাফল সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরালো করেছে। মেডিক্যাল জার্নাল দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে ২০২৩ সালে পরোক্ষ ধূমপানের সঙ্গে সম্পর্কিত কারণে ৩ লক্ষেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে ফুসফুসের বিভিন্ন রোগে আক্রান্তের সংখ্যাও উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিন ধরে অন্যের তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকলে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
বাড়ছে পরোক্ষ ধূমপানের ঝুঁকি
সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালের পর থেকে পরোক্ষ ধূমপানের সঙ্গে সম্পর্কিত ফুসফুসের রোগ ও হৃদ্রোগে মৃত্যুর হার প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ ঘর থেকে বাইরে—সর্বত্রই তামাকের ধোঁয়া ধূমপান না করা মানুষের জন্যও ক্রমশ বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও উদ্বেগের। বাড়ির বাবা-মা বা অন্য কোনও প্রাপ্তবয়স্ক নিয়মিত ঘরের ভিতরে ধূমপান করলে শিশুরাও অনিচ্ছাকৃত ভাবে সেই ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসে। ছোটদের ফুসফুস এখনও বিকাশের পর্যায়ে থাকায় তামাকের ধোঁয়ার ক্ষতিকর রাসায়নিক তাদের শ্বাসযন্ত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া-সহ বিভিন্ন শ্বাসযন্ত্রের সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কতটা ক্ষতিকর পরোক্ষ ধূমপান?
পরোক্ষ ধূমপানের প্রভাব শুধু ফুসফুসেই সীমাবদ্ধ নয়। তামাকের ধোঁয়ার বিভিন্ন রাসায়নিক শরীরের একাধিক অঙ্গ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির উপর এর প্রভাব বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তামাকের ধোঁয়ার রাসায়নিক রক্তনালির ভিতরের আস্তরণ বা এন্ডোথেলিয়ামের ক্ষতি করতে পারে। এর ফলে প্রদাহ এবং রক্তনালির কার্যকারিতায় সমস্যা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগ, হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ফুসফুসের পাশাপাশি কিডনি, লিভার, পাকস্থলী, মুখ ও গলার মতো বিভিন্ন অঙ্গেও তামাকের ধোঁয়ার ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। চোখের ক্ষেত্রেও ধূমপানের ধোঁয়া সমস্যা তৈরি করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে চোখের বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
মহিলাদের ক্ষেত্রেও পরোক্ষ ধূমপানের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। দীর্ঘদিন তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকলে প্রজননস্বাস্থ্য ও হরমোনের ভারসাম্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিশুদের জন্য আরও বেশি বিপজ্জনক
শিশুদের ক্ষেত্রে পরোক্ষ ধূমপানের প্রভাব দ্রুত দেখা দিতে পারে। নিয়মিত তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে এলে শ্বাসনালিতে প্রদাহ, কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং হাঁপানির সমস্যা বাড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসযন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাই বাড়িতে কেউ ধূমপান করলে শুধু ধূমপায়ীর স্বাস্থ্য নয়, পরিবারের অন্য সদস্যদের স্বাস্থ্য নিয়েও সতর্ক হওয়া জরুরি।
কীভাবে এড়াবেন পরোক্ষ ধূমপান?
পরোক্ষ ধূমপান থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী—
- বাড়ির ভিতরে ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করুন।
- জানলা খুলে বা ঘরের অন্য জায়গায় ধূমপান করলেও ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না।
- গাড়ির ভিতরে ধূমপান করবেন না। বন্ধ গাড়ির অল্প জায়গায় তামাকের ধোঁয়া দ্রুত জমে যায় এবং দীর্ঘ সময় বাতাসে থেকে যেতে পারে।
- কেউ সামনে ধূমপান করলে সম্ভব হলে সেখান থেকে সরে যান।
- শিশুদের ধূমপানের ধোঁয়ার সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখুন। বাড়িতে বা গাড়িতে তাদের সামনে কখনও ধূমপান করা উচিত নয়।
- কর্মস্থল বা অন্যান্য বন্ধ জায়গায় ধূমপান করা হলে সেই পরিবেশ এড়িয়ে চলুন।











