স্পোর্টস ডেস্ক: ম্যাচের ৮০ মিনিটও তখনও পেরোয়নি (Mohun Bagan vs East Bengal)। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের সবুজ-মেরুন গ্যালারি ক্রমশ ফাঁকা হতে শুরু করেছে। মোহনবাগানের কাছে ম্যাচের আশা তখন কার্যত শেষ। তার উপর প্রতি-আক্রমণে লাল-হলুদ যে ভাবে একের পর এক আক্রমণ তুলে আনছিল, তাতে যে কোনও মুহূর্তে আরও গোল হয়ে যেতে পারত। সেই গোল দেখার যন্ত্রণাই হয়তো গ্যালারি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের মনে একটাই প্রশ্ন—আর একটি গোল কি হবে? যদি হয়, তা হলে কি ৫০ বছর আগের সেই ঐতিহাসিক রাতের আরও একটু কাছে পৌঁছে যাবে লাল-হলুদ? এমন সুযোগ তো বারবার আসে না।
শেষ পর্যন্ত স্কোরলাইন দাঁড়াল ইস্টবেঙ্গল ৪, মোহনবাগান ১। লাল-হলুদ সমর্থকদের দীর্ঘদিন আনন্দ দেওয়ার জন্য এই ফলই যথেষ্ট। কিন্তু রবিবার যুবভারতীতে ইস্টবেঙ্গল যে পরিমাণ সহজ সুযোগ নষ্ট করেছে, সেগুলির কয়েকটি কাজে লাগাতে পারলেই স্কোরলাইন ৬-১, এমনকি তারও বেশি হতে পারত। আর তেমনটা হলে কলকাতা ডার্বির ইতিহাসের আরও একটি পুরনো অধ্যায় ছুঁয়ে ফেলতে পারত ইস্টবেঙ্গল।
প্রথমার্ধেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ইস্টবেঙ্গল। বিপিন সিংয়ের গোল এবং এডমুণ্ড লালরিনডিকার হ্যাটট্রিকে বিরতির আগেই ৪-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আন্তোনিয়ো লোপেজ হাবাসের দল। বলের দখল কিছুটা বেশি ছিল মোহনবাগানের কাছেই। কিন্তু সবুজ-মেরুন রক্ষণে তৈরি হচ্ছিল একের পর এক বড় ফাঁক। আর সেই ফাঁকগুলির প্রায় প্রতিটি সুযোগই প্রথম ৪৫ মিনিটে কাজে লাগায় ইস্টবেঙ্গল।
দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য গোলের সামনে সেই ধার আর পুরোপুরি ধরে রাখতে পারেনি লাল-হলুদ। তিন গোলের ব্যবধান বজায় রাখতে রক্ষণাত্মক ছকে চলে গেলেও প্রতি-আক্রমণে বারবার মোহনবাগানের বক্সে পৌঁছে যাচ্ছিল ইস্টবেঙ্গল। দ্বিতীয়ার্ধেই অন্তত তিনটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছিল ব্যবধান আরও বাড়ানোর।
৫৩ মিনিটে মহম্মদ রশিদের পাস থেকে নিজের চতুর্থ গোল করার সুযোগ এসেছিল এডমুণ্ডের সামনে। সামনে যথেষ্ট জায়গা পেয়েও শটটি ঠিকমতো নিতে পারেননি তিনি। কিছুক্ষণ পর ফের সুযোগ তৈরি করেন বিপিন সিং। একাই মোহনবাগানের দুই ডিফেন্ডারকে বিপাকে ফেলে গোলের পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর নেওয়া দুর্বল শট সহজেই আটকে দেন মোহনবাগানের গোলরক্ষক বিশাল কাইথ।
এডমুণ্ড মাঠ ছাড়ার পর পরিবর্ত হিসেবে নামা জেসিন টিকে থনিক্কারার কাছেও এসেছিল সুবর্ণ সুযোগ। মোহনবাগানের রক্ষণ ভেঙে বেরিয়ে সরাসরি বিশালের মুখোমুখি হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শট নিতে সামান্য দেরি করায় সময় পেয়ে যান মোহনবাগান গোলরক্ষক। এগিয়ে এসে বল আটকে দেন তিনি।
এই সুযোগগুলির মধ্যে মাত্র দু’টিও যদি কাজে লাগাতে পারত ইস্টবেঙ্গল, তা হলে স্কোরলাইন ৬-১ হওয়া অসম্ভব ছিল না। আর সেই ফল হলে ডার্বির ইতিহাসে ৫০ বছর আগের সেই রেকর্ডের সঙ্গে ফের একবার জুড়ে যেত রবিবারের ম্যাচের নাম।
কলকাতা ডার্বিতে ইস্টবেঙ্গলের সবচেয়ে বড় জয় এসেছিল ১৯৭৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। আইএফএ শিল্ডের ফাইনালে মোহনবাগানকে ৫-০ গোলে হারিয়েছিল লাল-হলুদ। শ্যাম থাপা, সুভাষ ভৌমিকদের সেই ঐতিহাসিক জয় আজও কলকাতা ডার্বিতে সর্বাধিক ব্যবধানে জয়ের রেকর্ড হয়ে রয়েছে।
রবিবার ইস্টবেঙ্গল ছ’টি গোল করতে পারলে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে এক ম্যাচে সর্বাধিক গোলের নিজেদের রেকর্ড নতুন করে লিখতে পারত। তবে ৬-১ ফল হলেও জয়ের ব্যবধান হত পাঁচ গোল—অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের সেই রেকর্ড স্পর্শ করত লাল-হলুদ। আর সর্বাধিক ব্যবধানের রেকর্ড ভাঙতে প্রয়োজন ছিল ৭-১ জয়।
শেষ পর্যন্ত সেই রেকর্ড অক্ষতই রইল। কিন্তু রবিবার ইস্টবেঙ্গল যে ভাবে মোহনবাগানের রক্ষণকে বারবার ছিন্নভিন্ন করেছে, তাতে ৪-১ ফলাফলও ম্যাচের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি তুলে ধরতে পারছে না। সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারলে এই ডার্বির স্কোরলাইন আরও ভয়াবহ হতে পারত সবুজ-মেরুনের জন্য। ইতিহাস লেখা হয়নি ঠিকই, তবে ৪-১-এর জয় দিয়েই ইস্টবেঙ্গল বুঝিয়ে দিল—সুযোগ পেলে সেই ইতিহাসের দরজায় ফের কড়া নাড়তে তারা প্রস্তুত।











