ওয়েব ডেস্ক: রেলস্টেশনের কল বা ওয়াটার কুলার থেকে জল খাওয়ার আগে এবার বাড়তি সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞেরা। নিয়ন্ত্রক ও মহাহিসাব পরীক্ষক (CAG)-এর সাম্প্রতিক অডিট রিপোর্টে দেশের একাধিক রেলস্টেশনের পানীয় জলের নমুনায় ই. কোলাই (E. coli) ব্যাক্টেরিয়ার উপস্থিতি ধরা পড়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, আটটি রেলস্টেশনের ওয়াটার কুলার থেকে নেওয়া জলের নমুনায় এই ব্যাক্টেরিয়া পাওয়া গিয়েছে। রেলযাত্রায় স্টেশনের পানীয় জলের উপর নির্ভর করেন বহু মানুষ। অনেকে স্টেশনের কল বা কুলার থেকে সরাসরি জল পান করেন, আবার অনেকে বোতলে ভরে সেই জল সঙ্গে নিয়ে ট্রেনে ওঠেন। ফলে পানীয় জলের মান নিয়ে CAG-এর এই রিপোর্ট স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পানীয় জলে ই. কোলাই কতটা বিপজ্জনক?
ই. কোলাই ব্যাক্টেরিয়ার অধিকাংশ প্রজাতি মানুষের অন্ত্রে স্বাভাবিকভাবেই থাকে এবং সাধারণত ক্ষতিকর নয়। কিন্তু এর কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতি সংক্রমণ ঘটাতে পারে। বিশেষ করে শিগা-টক্সিন উৎপাদনকারী ই. কোলাই বা STEC সংক্রমিত জল বা খাবারের মাধ্যমে শরীরে ঢুকলে গুরুতর অসুস্থতা হতে পারে। পানীয় জলে ই. কোলাইয়ের উপস্থিতি সাধারণত মলজাত দূষণের ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ জল কোনওভাবে মানুষের বা প্রাণীর মলমূত্রের সংস্পর্শে এসেছে—অপরিশোধিত জল, নোংরা জলাধার, নষ্ট বা দূষিত পাইপলাইন কিংবা নিকাশির জল মিশে যাওয়ার মতো একাধিক কারণে এমনটা হতে পারে।
অশোধিত জল পান করলে কী হতে পারে?
দূষিত জল পান করার পর ই. কোলাই সংক্রমণে পেটে ব্যথা, তীব্র পেটের মোচড়, ডায়রিয়া, বমি এবং কখনও জ্বর হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ডায়রিয়া রক্তাক্তও হতে পারে। উপসর্গের তীব্রতা নির্ভর করে কোন ধরনের ই. কোলাই শরীরে ঢুকেছে তার উপর। বিশেষ কিছু STEC সংক্রমণে ‘হেমোরেজিক কোলাইটিস’ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে তীব্র পেটব্যথার সঙ্গে রক্তাক্ত ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে গুরুতর জটিলতাগুলির একটি হল হিমোলাইটিক ইউরেমিক সিনড্রোম (HUS)। এই অবস্থায় লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি রক্তে প্লেটলেটের মাত্রা কমে এবং কিডনির কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে কিডনি বিকল হওয়া, স্থায়ী স্বাস্থ্যসমস্যা, এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।
তবে স্টেশনের জলে ই. কোলাই পাওয়া গিয়েছে মানেই সেই জল পান করলেই প্রত্যেকের গুরুতর অসুস্থতা হবে—এমন নয়। ঝুঁকি নির্ভর করে ব্যাক্টেরিয়ার ধরন, দূষণের মাত্রা এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার উপর। ছোট শিশু, প্রবীণ এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ গুরুতর হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলক বেশি।
শুধু ই. কোলাই নয়, উঠছে জলের উৎস নিয়েও প্রশ্ন
ই. কোলাইয়ের উপস্থিতি শুধু একটি ব্যাক্টেরিয়ার সমস্যা নয়; এটি পানীয় জলের উৎস ও পরিশোধন ব্যবস্থার মান নিয়েও প্রশ্ন তোলে। CAG-এর অডিটে রেলস্টেশনগুলিতে পানীয় জল এবং অন্যান্য ন্যূনতম যাত্রী-সুবিধা নিয়ে একাধিক ঘাটতির কথা উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও স্টেশনের পানীয় জলে মলজাত দূষণের প্রমাণ মিললে সেই জলের উৎস, পাইপলাইন, জলাধার, ওয়াটার কুলারের পরিচ্ছন্নতা এবং নিয়মিত জীবাণুনাশ ও জল পরীক্ষা—সবকিছুই খতিয়ে দেখা জরুরি।
কী করবেন যাত্রীরা?
স্টেশনের পানীয় জলের মান নিয়ে সন্দেহ থাকলে সরাসরি সেই জল পান না করাই নিরাপদ। বিশেষ করে দূষণের খবর জানা থাকলে বোতলজাত বা নির্ভরযোগ্যভাবে পরিশোধিত জল ব্যবহার করা উচিত। দূষিত জল ফুটিয়ে নেওয়া বা উপযুক্ত জল পরিশোধন ব্যবস্থার মাধ্যমেও জীবাণু দূর করা যায়। স্টেশনের জল খাওয়ার পর দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া বা বমি, রক্তমিশ্রিত পায়খানা, তীব্র পেটব্যথা কিংবা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে রক্তমিশ্রিত ডায়রিয়া বা HUS-এর সম্ভাব্য লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
রেলস্টেশনের পানীয় জল যাত্রীদের মৌলিক পরিষেবা। তাই শুধু দূষিত জলের নমুনা চিহ্নিত করাই নয়, সেই দূষণের উৎস খুঁজে বের করে নিয়মিত পরীক্ষা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং কার্যকর জল পরিশোধন ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।











