ওয়েব ডেস্ক: ঘূর্ণিঝড় আমপান-পরবর্তী ত্রাণ বণ্টনে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রস্তুত হওয়া কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (ক্যাগ)-এর রিপোর্ট শনিবার বিধানসভায় পেশ করা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার বিধানসভায় তিনি বলেন, আগের সরকার বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও রিপোর্টটি পেশ করেনি। বর্তমান সরকার সেই রিপোর্ট প্রকাশ্যে এনে তার উপর বিস্তারিত আলোচনা করবে এবং রিপোর্টে উল্লিখিত সুপারিশ অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, বিধানসভায় ক্যাগ রিপোর্ট পেশ করা এবং তা নিয়ে আলোচনা করা সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অংশ। তাঁর অভিযোগ, পূর্ববর্তী সরকার সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি। তিনি বলেন, “ক্যাগ রিপোর্টগুলি এই সদনে পেশ করা, তার উপরে আলোচনা ইত্যাদি বাধ্যতামূলক ছিল। বিগত সরকার তা করেনি। আগামী ২৫ তারিখ ক্যাগের রিপোর্টগুলি পেশ হবেই। পরবর্তী সেশনে আমরা সেই রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা এবং যা সুপারিশ রয়েছে, তার উপর সিদ্ধান্ত নেব।”
দুর্নীতির অভিযোগে কারও বিরুদ্ধে প্রমাণ মিললে তাঁর পদ বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও স্পষ্ট বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “যেখানে যেখানে দুর্নীতির প্রমাণ থাকবে, আমরা মহামান্য রাজ্যপালের কাছে সুপারিশ করব। তিনি মুখ্যমন্ত্রী হোন, মন্ত্রী হোন আর যত বড় নেতাই হোন— তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর করার জন্য আমরা রাজ্যপালের কাছে সুপারিশ করব।”
আমপান ত্রাণে অনিয়মের অভিযোগ
২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় আমপানে পশ্চিমবঙ্গের উপকূলবর্তী ও সংলগ্ন জেলাগুলিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ত্রাণের জন্য কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে বিপুল আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। সেই অর্থ ও ত্রাণসামগ্রী বণ্টনে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ছিল, বহু প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন, অন্যদিকে অনিয়ম করে অনেকের নামে ত্রাণের অর্থ বরাদ্দ করা হয়।
এই প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আমপানের সময় দু’দফায় ৩৭৫০ কোটি টাকা দিয়েছিলেন। আমপানে বড় দুর্নীতি হয়। কলকাতা হাই কোর্টে জনস্বার্থ মামলা হয়। তার প্রেক্ষিতে বিশেষ ক্যাগ তদন্ত হয়েছিল। কিন্তু সেই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনা হয়নি। সেখানে যাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল, তা-ও কার্যকর করা হয়নি।”
রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা
আমপান দুর্নীতির অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকা, বিশেষ করে ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের নাম অতীতেও একাধিকবার উঠে এসেছে। তবে ক্যাগ রিপোর্টে ওই অঞ্চল বা কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে কী পর্যবেক্ষণ বা সুপারিশ রয়েছে, তা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। রিপোর্ট বিধানসভায় পেশ হওয়ার পরই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
ইতিমধ্যেই বিরোধী রাজনৈতিক মহলে এই ঘোষণাকে ঘিরে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, রিপোর্ট প্রকাশের পর রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হতে পারে। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট বিরোধী নেতৃত্বের পক্ষ থেকে অতীতেও অভিযোগ করা হয়েছে যে, তাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
সাংবিধানিক সংস্থাগুলিকে সক্রিয় করার ঘোষণা
বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform Civil Code) নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাইয়ের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির রিপোর্টও শীঘ্রই সরকারের হাতে আসবে।
এছাড়া তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে মানবাধিকার কমিশন, মহিলা কমিশন, শিশু সুরক্ষা কমিশন, সংখ্যালঘু কমিশন এবং তফসিলি জাতি ও জনজাতি কমিশনের মতো একাধিক সাংবিধানিক সংস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। তাঁর ঘোষণা, আগামী ১ আগস্ট থেকে এই সংস্থাগুলি পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ শুরু করবে এবং নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণ করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
ক্যাগ রিপোর্ট বিধানসভায় পেশ হওয়ার পর তার বিষয়বস্তু এবং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন রাজনৈতিক মহলের নজর।











